মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ বাংলাদেশের প্রধান ভ্যাট আইন, যা ১ জুলাই ২০১৯ থেকে কার্যকর হয়ে মূসক আইন ১৯৯১ প্রতিস্থাপন করেছে। এই আইন ও মূসক বিধিমালা ২০১৬ অনুযায়ী সাধারণ মূসক হার ১৫%, তফসিলে হ্রাসকৃত হার ও অব্যাহতি রয়েছে। নিবন্ধন, চালানপত্র, রেয়াত, উৎসে কর্তন, মাসিক রিটার্ন ও আপিলের নিয়ম এই আইনে নির্ধারিত।
মূসক ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২ (ভ্যাট আইন ২০১২) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তার মূসক কমিশনারেট, বৃহৎ করদাতা ইউনিট এবং বিভাগ ও সার্কেল অফিসের মাধ্যমে প্রয়োগ করে। আইনটির মূল লেখা বাংলায়, তাই অনেক ব্যবসায়ী বাংলায় পড়তে স্বস্তি বোধ করেন। তবে আইনি ভাষা জটিল হওয়ায় একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর পক্ষে কোন ধারা তার ব্যবসায় কীভাবে প্রযোজ্য, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পাতাটি দোকান মালিক, ছোট ও মাঝারি উৎপাদক, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং হিসাব বিভাগের কর্মীদের জন্য লেখা, যারা আইনের মূল কাঠামো সহজ বাংলায় জানতে চান। এখানে প্রতি বছর বদলে যাওয়া হার বা সীমার সংখ্যা দেওয়া হয়নি, কারণ সেগুলো অর্থ আইন ও এসআরও দিয়ে পরিবর্তিত হয়। ইংরেজিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য আমাদের VAT & SD Act 2012 পাতাটি দেখুন।
এই পাতায়
মূসক ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
মূল্য সংযোজন কর বা মূসক হলো পণ্য ও সেবার প্রতিটি হাতবদলের ধাপে আরোপিত পরোক্ষ কর। ক্রেতা শেষ পর্যন্ত করটি বহন করেন, কিন্তু সরকারের কাছে জমা দেওয়ার দায়িত্ব নিবন্ধিত ব্যবসায়ীর। সম্পূরক শুল্ক নির্দিষ্ট কিছু পণ্য ও সেবার ওপর অতিরিক্ত শুল্ক, যা একই আইনে নির্ধারিত এবং একই মাসিক রিটার্নে দেখাতে হয়।
আইনটিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তফসিল আছে: প্রথম তফসিলে মূসক অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য ও সেবা, দ্বিতীয় তফসিলে সম্পূরক শুল্কযোগ্য পণ্য ও সেবা এবং তৃতীয় তফসিলে হ্রাসকৃত হারের পণ্য ও সেবা। আপনার পণ্য বা সেবা কোন তালিকায় পড়ে, সেটিই ঠিক করে আপনাকে কত হারে মূসক দিতে হবে।
কাদের নিবন্ধন নিতে হবে
আইন অনুযায়ী বার্ষিক টার্নওভার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে মূসক নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। এর চেয়ে কম টার্নওভারের ব্যবসা টার্নওভার করের জন্য তালিকাভুক্ত হয়। সীমাগুলো অর্থ আইনের মাধ্যমে সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়, তাই চলতি বছরের সীমা যাচাই করে নিন।
- আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক, টার্নওভার যা-ই হোক
- সরকারি বা বেসরকারি দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠান
- নির্ধারিত সীমার বেশি টার্নওভারের উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও সেবা প্রদানকারী
- উপকরণ কর রেয়াত নিতে চাইলে স্বেচ্ছায় নিবন্ধন নেওয়া যায়
- অনলাইনে মূসক-২.১ ফরমে আবেদন করলে অনুমোদনের পর মূসক-২.৩ নিবন্ধনপত্রে বিআইএন দেওয়া হয়
আমাদের দিয়ে করিয়ে নিতে চান?
হোয়াটসঅ্যাপে আপনার বিষয়টি জানান, কী কী লাগবে আমরা পরিষ্কার করে জানিয়ে দেব।
নিবন্ধিত ব্যবসায়ীর প্রতি মাসের করণীয়
- প্রতিটি করযোগ্য সরবরাহে মূসক-৬.৩ কর চালানপত্র ইস্যু করা
- ক্রয় হিসাব পুস্তক (মূসক-৬.১) ও বিক্রয় হিসাব পুস্তক (মূসক-৬.২) হালনাগাদ রাখা
- উৎপাদক হলে সরবরাহের আগে মূসক-৪.৩ ফরমে উপকরণ-উৎপাদ সহগ ঘোষণা দেওয়া
- উৎসে কর্তনকারী সত্তা হলে সরবরাহকারীর বিল থেকে মূসক কেটে জমা দেওয়া এবং মূসক-৬.৬ সনদ দেওয়া
- পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে অনলাইনে মূসক-৯.১ দাখিলপত্র (রিটার্ন) জমা দেওয়া, লেনদেন না থাকলেও শূন্য রিটার্ন
- আইনে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সব দলিল ও রেকর্ড সংরক্ষণ করা
উপকরণ কর রেয়াত ও উৎসে কর্তন সহজ ভাষায়
উপকরণ কর রেয়াত মানে হলো কাঁচামাল বা সেবা কেনার সময় আপনি যে মূসক দিয়েছেন, তা বিক্রয়ের ওপর আদায়কৃত মূসক থেকে বাদ দেওয়া। উদাহরণস্বরূপ, একজন উৎপাদক কাঁচামাল কেনার সময় মূসক দিলেন, পরে পণ্য বিক্রি করে মূসক আদায় করলেন; তিনি সরকারকে শুধু পার্থক্যটুকু জমা দেবেন। তবে রেয়াত পেতে হলে নিজের নাম ও বিআইএন সম্বলিত বৈধ মূসক-৬.৩ চালানপত্র থাকতে হবে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি করতে হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকিং চ্যানেলে মূল্য পরিশোধ করতে হবে। কিছু ক্রয়ে রেয়াত নেওয়া যায় না।
উৎসে কর্তন বা ভিডিএস হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, এনজিও, লিমিটেড কোম্পানিসহ নির্দিষ্ট সত্তা কর্তৃক সরবরাহকারীর বিল পরিশোধের সময় মূসক কেটে রাখা। কর্তনকারী সত্তা টাকা জমা দিয়ে মূসক-৬.৬ সনদ দেয়, আর সরবরাহকারী সেই সনদ দিয়ে নিজের রিটার্নে সমন্বয় নেয়। সনদ সংগ্রহ না করলে সরবরাহকারী সমন্বয় হারাতে পারেন।
জরিমানা, নিরীক্ষা ও আপিল
দেরিতে রিটার্ন দাখিল, কম মূসক প্রদান, চালানপত্র ছাড়া বিক্রয় বা হিসাব না রাখার জন্য আইনে জরিমানা ও সুদের বিধান আছে। মূসক কর্মকর্তা রেকর্ড তলব, নিরীক্ষা এবং প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতে পারেন। কর ফাঁকির সন্দেহ হলে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয় এবং শুনানির পর চূড়ান্ত আদেশ জারি হয়।
আদেশে সংক্ষুব্ধ হলে সাধারণত কমিশনার (আপিল) এবং পরে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালে আপিল করা যায়, আইনি প্রশ্নে হাইকোর্ট বিভাগেও যাওয়া যায়। আপিলের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও বিরোধীয় অর্থের একটি অংশ জমার শর্ত থাকতে পারে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) সুযোগও রয়েছে। নোটিশ পেলে দেরি না করে পরামর্শ নিন।
কাজের ধাপসমূহ
- পণ্য ও সেবা চিহ্নিত করাআপনার প্রতিটি পণ্য ও সেবার এইচএস কোড বা সেবা কোড এবং প্রযোজ্য হার, অব্যাহতি বা সম্পূরক শুল্ক নির্ধারণ করা হয়।
- নিবন্ধন যাচাইবিআইএন, নিবন্ধিত কার্যক্রম ও ঠিকানা বাস্তব ব্যবসার সঙ্গে মিলছে কি না দেখা হয়।
- রেকর্ড ঠিক করামূসক-৬.১, ৬.২ ও ৬.৩ সঠিক ফরম্যাটে রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
- রেয়াত ও ভিডিএস হিসাবপ্রতি মাসে প্রাপ্য রেয়াত, উৎসে কর্তন ও সমন্বয় হিসাব করা হয়।
- রিটার্ন দাখিল১৫ তারিখের আগে অনলাইনে মূসক-৯.১ জমা ও কর পরিশোধ নিশ্চিত করা হয়।
- নোটিশের জবাবকোনো নোটিশ বা নিরীক্ষা হলে প্রয়োজনীয় কাগজসহ লিখিত জবাব প্রস্তুত করা হয়।
সাধারণ সময়সীমা: একটি সাধারণ ব্যবসার জন্য আইন প্রয়োগের পর্যালোচনা ও রেকর্ড গোছাতে সাধারণত এক থেকে তিন সপ্তাহ লাগে, তবে তা কাগজপত্রের অবস্থা ও লেনদেনের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে।
আমরা যেভাবে সাহায্য করি
- আপনার ব্যবসায় আইনের কোন ধারা ও তফসিল প্রযোজ্য, তার বাংলায় লিখিত ব্যাখ্যা
- বিআইএন নিবন্ধন ও সংশোধনে সহায়তা
- মাসিক মূসক-৯.১ রিটার্ন প্রস্তুত ও দাখিল
- হিসাব বিভাগের কর্মীদের জন্য বাংলায় মূসক প্রশিক্ষণ
- নোটিশ, নিরীক্ষা ও আপিলের কাগজপত্র প্রস্তুত
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
মূসক আইন ২০১২ কবে থেকে কার্যকর?
আইনটি ২০১২ সালে পাস হলেও বাস্তবায়ন কয়েক দফা পিছিয়ে যায়। এটি ১ জুলাই ২০১৯ থেকে মূসক বিধিমালা ২০১৬ সহ কার্যকর হয় এবং মূসক আইন ১৯৯১ রহিত করে। তবে ২০১৯ সালের আগের সময়ের মামলা ও দায় সাধারণত পুরোনো আইনের সংরক্ষণ বিধান অনুযায়ী নিষ্পত্তি হয়।
মূসকের হার কত?
সাধারণ হার ১৫%। তবে তৃতীয় তফসিলে অনেক পণ্য ও সেবার জন্য হ্রাসকৃত হার, প্রথম তফসিলে অব্যাহতি এবং দ্বিতীয় তফসিলে সম্পূরক শুল্ক নির্ধারিত আছে। প্রতি বছর অর্থ আইন ও এসআরও দিয়ে এগুলো বদলাতে পারে, তাই নিজের পণ্য বা সেবার চলতি হার যাচাই করে নিন। ভুল হার প্রয়োগ করলে নিরীক্ষায় দাবিনামা জারি হতে পারে।
বিক্রি না হলেও কি রিটার্ন দিতে হবে?
হ্যাঁ। নিবন্ধিত বা তালিকাভুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রতি মাসে পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে মূসক-৯.১ রিটার্ন দিতে হয়, লেনদেন না থাকলে শূন্য রিটার্ন। রিটার্ন না দিলে জরিমানা হতে পারে এবং পরে দরপত্র বা ব্যাংকের কাজে সমস্যা হয়। অনলাইনে শূন্য রিটার্ন জমা দিতে কয়েক মিনিটই যথেষ্ট, তাই এটি নিয়মিত করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
বিআইএন আর ই-টিআইএন কি একই?
না। ই-টিআইএন আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী আয়করের সনাক্তকরণ নম্বর, আর বিআইএন হলো মূসক আইন ২০১২ অনুযায়ী ব্যবসার মূসক নিবন্ধন নম্বর। বেশিরভাগ ব্যবসার দুটোই লাগে, এবং বিআইএন আবেদনের সময় সাধারণত ই-টিআইএন প্রয়োজন হয়। তাই নতুন ব্যবসা শুরু করলে আগে ই-টিআইএন নিন, তারপর বিআইএনের জন্য আবেদন করুন।
আইনের মূল বাংলা লেখা কোথায় পাব?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওয়েবসাইটে আইন, বিধিমালা, তফসিল ও এসআরও প্রকাশ করা হয়, এবং বাংলাদেশ কোডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও আইনটি পাওয়া যায়। প্রতি বছর অর্থ আইনে সংশোধন হয়, তাই সর্বশেষ সংশোধিত সংস্করণটি পড়ছেন কি না নিশ্চিত হোন। প্রয়োজনে আমাদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে আপনার নির্দিষ্ট অবস্থা জেনে নিতে পারেন।
ছোট দোকানেরও কি মূসক দিতে হয়?
টার্নওভার নিবন্ধন সীমার নিচে হলে সাধারণত টার্নওভার করের জন্য তালিকাভুক্ত হতে হয়, যার নিয়ম পূর্ণ মূসকের চেয়ে সহজ। একেবারে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য আলাদা সীমা থাকতে পারে। তবে কিছু নির্দিষ্ট ব্যবসা বা এলাকার জন্য বিশেষ বিধান আছে, তাই নিজের অবস্থা যাচাই করুন।
VAT & SD Act 2012 Bangla নিয়ে কাজ শুরু করতে চান?
হোয়াটসঅ্যাপে আমাদের টিমের সাথে কথা বলুন।
সম্পর্কিত সেবা
VAT & SD Act 2012: A Practical Guide to Bangladesh's VAT Law
The VAT & SD Act 2012 (Value Added Tax and Supplementary Duty Act 2012) is Bangladesh's main indirect tax law. In force…
বিস্তারিত →Obtaining BIN (VAT Registration) in Bangladesh
Obtaining BIN means registering your business for VAT with the National Board of Revenue under the VAT and…
বিস্তারিত →Value Added Tax (VAT) Services in Bangladesh
Value Added Tax (VAT) services in Bangladesh cover the ongoing compliance a registered business must meet under the VAT…
বিস্তারিত →SRO (Statutory Regulatory Order) in Bangladesh
An SRO (Statutory Regulatory Order) in Bangladesh is a legal instrument published in the official Gazette under powers…
বিস্তারিত →Value Added Tax Act 1991 (Law-1991) in Bangladesh
The Value Added Tax Act 1991 (Law-1991) introduced VAT in Bangladesh from 1 July 1991 and governed it for 28 years. It…
বিস্তারিত →Surveys, Inspections & Audit: Handling NBR Visits in Bangladesh
Surveys, inspections and audit are the ways Bangladesh's revenue authorities check compliance on the ground. Tax and…
বিস্তারিত →সর্বশেষ পর্যালোচনা: . প্রতি অর্থ আইন, এসআরও ও সার্কুলারে নিয়ম বদলায়। এটি সাধারণ নির্দেশনা; দাখিলের আগে বর্তমান নিয়ম যাচাই করুন।
